গ্রামীণ আবাস যোজনায় প্রকৃত উপভোক্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এবার যুগান্তকারী বদল আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। পূর্বাতন সরকারের আমল থেকে এই প্রকল্পে দুর্নীতির নানা অভিযোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তরজা অব্যাহত ছিল। প্রকৃত দাবিদারদের বদলে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠদের নাম তালিকায় ওঠার মতো গুরুতর অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।
এবার রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর সেই সমস্ত বিতর্কে পাকাপাকিভাবে ইতি টানতে এবং গোটা প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করতে বড়সড় পদক্ষেপ করল প্রশাসন। ভিন রাজ্যের মডেলে এবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারও গ্রামীণ আবাস প্রকল্পে ‘সেল্ফ সার্ভে’ বা স্ব-সমীক্ষা পদ্ধতি চালু করতে চলেছে। প্রশাসনিক সদর দফতর তথা নবান্ন সূত্রে খবর, এই নয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কোনও মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি নিজেদের আবাস প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রাথমিক আবেদনের পর সরকারি স্তরে নিবিড় যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত উপভোক্তা তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
গোটা প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে গত ৩০ মে রাজ্যের প্রতিটি জেলার জেলাশাসকদের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত নির্দেশিকা পাঠিয়েছে নবান্ন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যাঁরা আবাস যোজনার সুবিধা পেতে ইচ্ছুক, তাঁদের প্রথমেই নিজস্ব মোবাইল ফোনে ‘আবাসপ্লাস ২০২৪’ এবং ‘আধারফেস আরডি’ নামের দু’টি নির্দিষ্ট অ্যাপ ডাউনলোড করে নিতে হবে। এরপর সেই অ্যাপের মাধ্যমে আধার-ভিত্তিক ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের পর তাঁরা অত্যন্ত সহজে নিজেদের আবেদন জমা করতে পারবেন। অনলাইনে এই আবেদন জমা পড়ার পরেই শুরু হবে প্রশাসনিক পদক্ষেপ। সরকারের নিযুক্ত বিশেষ সমীক্ষক বা সার্ভেয়াররা আবেদনকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সরাসরি তাঁর বাড়িতে গিয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবেন। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী ওই পরিবারটি বাড়ি পাওয়ার প্রকৃত যোগ্য কি না, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিচার করা হবে।
তবে রাজ্যের গ্রামীণ এলাকার একটি বিশাল অংশের মানুষের কাছে এখনও স্মার্টফোন পৌঁছয়নি বা তাঁরা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে ততটা পারদর্শী নন। এই সমস্ত প্রান্তিক মানুষের কথা মাথায় রেখে বিশেষ বিকল্প ব্যবস্থার কথাও নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, শুধুমাত্র অনলাইন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেই এই প্রকল্প সীমাবদ্ধ থাকবে না। যাঁরা প্রযুক্তিগত কারণে বা অন্য কোনও বাধ্যবাধকতার কারণে নিজেরা অনলাইনে আবেদন করতে ব্যর্থ হবেন, তাঁদের জন্য সার্ভেয়াররা নিজে থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করার কাজ করবেন। প্রশাসন কড়া নজর রাখছে যাতে কোনও প্রকৃত ও যোগ্য উপভোক্তা স্রেফ প্রযুক্তির অভাবে বা তথ্যের অভাবে সরকারি এই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে তালিকার বাইরে থেকে না যান।
দুর্নীতিমুক্ত তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্যে রাজ্য সরকার এবার ত্রিস্তরীয় এক নিশ্ছিদ্র যাচাই ব্যবস্থা বা ক্রস-চেকিং মেকানিজম চালু করতে চলেছে। উপভোক্তাদের তালিকা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে যাতে সর্বোচ্চ স্তরের স্বচ্ছতা বজায় থাকে, সেই মর্মে জেলা প্রশাসনগুলিকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবান্নের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাথমিক তালিকা তৈরি হওয়ার পর অন্তত ১০ শতাংশ পরিবারের তথ্য ব্লক বা মহকুমা স্তরের পদস্থ আধিকারিকদের মাধ্যমে পুনরায় যাচাই বা রি-ভেরিফাই করতে হবে। এর পাশাপাশি, ৫ শতাংশ উপভোক্তার ক্ষেত্রে ব্লক স্তরের আধিকারিকদের দিয়ে পৃথকভাবে একটি পর্যালোচনা করানো হবে। এখানেই শেষ নয়, মোট উপভোক্তার ২ শতাংশের ক্ষেত্রে স্বয়ং জেলাস্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা সরাসরি মাঠে নেমে তথ্য যাচাই করবেন। প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই নিবিড় ও বহুমাত্রিক নজরদারির ফলে আবেদনপত্রে থাকা সম্ভাব্য অনিয়ম, দুর্নীতি বা ভুলত্রুটি সহজেই ধরা পড়বে এবং তা সংশোধন করা সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্য সরকারের এই নয়া পদ্ধতি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আবাস প্রকল্পে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর হবে। এর ফলে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, স্থানীয় নেতাদের প্রভাব খাটানো বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বেআইনিভাবে নাম অন্তর্ভুক্তির যে চিরাচরিত অভিযোগগুলি ওঠে, তা অনেকাংশেই কমানো যাবে। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং নির্ভুল উপভোক্তা তালিকা তৈরির লক্ষ্যে আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে সমগ্র রাজ্যের সমীক্ষা এবং যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার চূড়ান্ত ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরগুলিকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছে নবান্ন।